ঢাকা, সোমবার, ২৪শে জুন ২০১৯ , ১০ই আষাঢ় ১৪২৬, সন্ধ্যা ৭:৩৯

সুধীর, ভারতীয় মিডিয়া এবং আমাদের ভয়

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়:

সুধীরকে কী মারা হয়েছে? সুধীরের শরীরে কী জখম আছে?

সুধীরের ভিডিওটা কী আগেই আপ করা হয়েছে? এটা কী একটা ফেক ভিডিও?

এগুলো ফালতু প্রশ্ন।

সুধীরের সঙ্গে কিছু একটা হয়েছে। এটা নিশ্চিত যে, কিছু একটা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, সেই কিছু একটা কী?

সকাল থেকে অন্তত পঞ্চাশ জন দর্শকের সঙ্গে কথা বলেছি আমি। যারা ওখানে উপস্থিত ছিলেন, এমন অন্তত জনা কয়েকের সঙ্গে কথা বলেছি। কথা বলেছি টাইগার শোয়েবের সঙ্গেও। রাতে সর্বশেষ সুধীরের আরেক দফা সাক্ষাতকারও দেখলাম।

দৃশ্যটা পরিষ্কার:

সুধীর স্টেডিয়াম গেট থেকে বেরিয়েছেন। জয়ের আনন্দে মাতাল এক ঝাক মানুষ তাকে ঘিরে ধরে `ভুয়া ভুয়া‘ বলেছে। সুধীর ভয়ে একটা দোকানে গিয়ে লুকিয়েছেন। পরে সেখান থেকে পুলিশ তাকে সিএনজি ঠিক করে দিয়েছে। এরপর নাকি সুধীরের সিএনজিতে পাথর মারা হয়েছে।

`পাথর‘ ব্যাপারটা অবশ্য চিরকালই রহস্যময়। ক্রিস গেইল বলেছিলেন, তাদের টিম বাসে পাথর মারা হয়েছে, সুধীরও বলছেন। মিরপুরে এতো পাথর কোত্থেকে আসে, কে জানে!

আমি মিরপুরে কখনো পাথর দেখিনি।

এটা বলে অবশ্য বিষয়টা হালকা করার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টা গুরুতর। গত বেশ কিছুকাল ধরেই আমরা বলার চেষ্টা করছি, এটা অন্যায়।

কী অন্যায়?

অন্যায় হলো, যে কোনো জয়ের পর মিরপুর দশ নম্বর ও তার আশেপাশের রাস্তা জুড়ে যে মাতলামি হয়। এখানে সুধীর ব্যাপার না। সুধীরের ব্যাপারটা ভুলে যান। স্টেডিয়ামে অনেক মেয়ে যায় খেলা দেখতে; এমন সব জয়ের পর সেই মেয়েদের মুখের সামনে গিয়ে যে বিকৃত ভঙ্গিতে উল্লাস করা হয়, যেভাবে গাড়িঘোড়ায় সামনে গিয়ে মাতলামি করা হয়; তা একেবারেই নিন্দনীয়।

কোনো রোমান্টিসিজম দিয়ে এর সমর্থন করা যাবে না।

এটা স্রেফ মাতলামি; এই মাতালদের কোনো দল নেই, ক্রিকেট নেই, পক্ষ নেই; স্রেফ জয়টাকে উপলক্ষ বানিয়ে একটা `মব‘ তৈরী করে।

আইরনি হলো, সুধীর সেই মাতালদের শিকার হয়েছেন। এখানে সুধীরকে `সুধীর‘ বলে কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে আক্রমণ করেছে; এটা একেবারেই মিথ্যে কথা। আর মজাটা হলো, গতকাল সারাদিন ধরে ভারতীয় মিডিয়া এই মিথ্যেটা প্রচার করার চেষ্টা করেছে।

পুরো ব্যাপারটা এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে, সুধীরকে যেন বা ভারতীয় বলে টার্গেট করে মারা হয়েছে। তেমন করেই তার সাক্ষাতকার ও খবর উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছে। এটাকেেএক কথায় বলে অতিরঞ্জন।

বাংলাদেশ-ভারত সিরিজের শুরু থেকে ভারতীয় মিডিয়া এই অতিরঞ্জন করে যাচ্ছে; স্রেফ সমগ্রোত্রীয় বলে চুপ থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু গত কয়েক দিন এটা সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে।

ভারতীয় কিছু সংবাদ মাধ্যম নানা ধরণের আশেপাশের খবর প্রচার করে এমন একটা আবহ তৈরী করছে যে, বাংলাদেশ একটা জঙ্গল এবং এখানে কোটি কয়েক হায়না ভারতীয়দের বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষনা করে বসেছে!

কোথায় হ্যাপির সাক্ষাতকার, কোথায় রুবেলের অতীত টেনে এনে নানাভাবে প্রমানের চেষ্টা; এটা খেলা নয় যুদ্ধ।
এই করতে গিয়ে নিয়মিত বিভ্রান্তিকর ও অসত্য খবর প্রকাশ করা হচ্ছে।

এতে করে এমন অবস্থা দাড়িয়েছে যে, ফেসবুকে লোকেরা প্রশ্ন তুলছে, বাংলাদেশে বসে আমরা এসব মহা খবর লিখতে পারছি না; ওনারা কিভাবে বেড়াতে এসে পেরে ফেলছেন?

উদাহরণ দেই কয়েকটা।

প্রথমেই সুধীর বিষয়ে বলি। এই সুধীর অন্তত আট বার বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। সুধীরকে `বিসিএসএ‘ নামের বাংলাদেশ সমর্থকদের সংগঠন সম্বর্ধনাও দিয়েছে। সুধীর নিজে সেখানে বলেছেন, `ভারতেও এতো সম্মান পাননি কখনো তিনি।‘

সুধীরের ভিসার জন্য, আপ্যায়নের জন্য `বিসিএসএ‘ দফায় দফায় ত’পরতা দেখিয়েছে, দূতাবাসে স্পন্সরশিপ, ইনভাইটেশন লেটার পর্যন্ত পাঠিয়েছে।

আজ যখন সুধীরকে কেন্দ্র করে সব সমর্থককে ভিলেন বানাচ্ছেন, তখন ওই সমর্থকদের কথা ভুলে যাচ্ছেন আপনারা!

এবার আসুন রগরগে কয়েকটা খবরে।

প্রথম ওয়ানডের পর ভারতের সবচেয়ে নামকরা একটি বাংলা পত্রিকায় লেখা হলো, রাত দুটোয় ধোনিদের চাপে আম্পায়ারের রিপোর্টে মুস্তাফিজের নাম যোগ করা হয়েছে।

আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি, এটা মিথ্যা খবর।

আমি জেনে বলছি, মুস্তাফিজের নাম শুরু থেকে আম্পায়ারদের রিপোর্টে ছিলো। রাত দুটোয় কোনো গোলমাল হয়নি। কোনো উত্তাপ ছড়ায়নি। এটা স্রেফ পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার একটা চেষ্টা ছিলো।

এরপর ধরুন, একটা সংবাদ মাধ্যমে মুস্তাফিজুরের মুখে কোট বসিয়ে দেওয়া হলো, ফিক্সিং করলেও মুস্তাফিজুর মোহাম্মদ আমিরের ভক্ত!

অথচ ঘটনাটা শুনে দেখুন।

তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, `তোমার আইডল কে?‘

মুস্তাফিজ `আইডল‘ বোঝেনি; বার কয়েক বোঝানোর পর বললো, `আমিরের বোলিং ভালো লাগতো‘; হ্যা, লাগতো বললো। এরপর তিন বার করে ওই ভারতীয় সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, আমির ফিক্সিং করে জেনেও পছন্দ করেন?

ইংরেজী এই প্রশ্নের মাথামুন্ডু না বুঝে পরের প্রশ্নে চলে গেছে ফ্লোর। তখনও ওই সাংবাদিকের চাপে আবার মিডিয়া ম্যানেজার বাধ্য হলেন শুনে ইংরেজীতে উত্তর দিতে। মিডিয়া ম্যানেজার বলেছিলেন, `হি অনলি ফলো আমির বোলিং; নট হিস লাইফ।‘

অথচ দেখেন, কী বসিয়ে দেওয়া হলো ছেলেটার মুখে!

আর শেষ খবর হলো, মাশরাফি নাকি মুস্তাফিজকে নিয়ে ধোনির কাছে গেছে; আইপিএল খেলার সুযোগ করে দিতে!

মিথ্যেরও একটা সীমা আছে।

আমি মাশরাফিকে ম্যাসেজ দিয়ে জানালাম খবরটা। সে জীবনে প্রথমবারের মতো চটেছে আজ আমার ওপর। নিজের লজ্জা লাখছে, এক যুগ ধরে ছেলেটার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশেও কী করে আমি এই খবরের সত্যতা যাচাই করতে গেলাম!

আমি কেন বুঝলাম না, মাশরাফি দুনিয়ায় কাউরে কুর্নিশ করে চলে না; কোথায় ধোনি!

যাই হোক, লেখার এই পর্যায়ে এসে তাদের ওপর রাগটা কমেছে।

এবার ব্যাখ্যাটা দেই। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম আসলে দুটো কাজ করার চেষ্টা করছে। এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খবরগুলো নোংরা ভাবে ছড়িয়ে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের বিকল্প হিসেবে দাড় করানোর চেষ্টা করছে; তাতে তাদের এই হারের মর্যাদা একটু বাড়ে।

আরেকটা কাজ করছে, কেদে কেটে এটাকে বাংলাদেশের কাছে নয়, বাংলার কাছে হার বলে বোঝাতে চাইছে।

তাতে ভারতের দায় কলকাতার ঘাড়ে আসে না। এ ক্ষেত্রে যেন ঢাকা-কলকাতা ভাই ভাই।

জ্বি না, জনাব। ও মিমাংসা হয়ে গেছে অনেক আগে। আমরা মাসতুতো ভাই, পিসতুতো ভাই হতে পারি; ভাই কিছুতেই নই। আমরা ভারতীয় বা পাকিস্তানীদের ভাই হতে চাই না।

চাই না বলেই নিজেদের লোকেদের ওপর এতো রাগ হয়।

এই যে, জিতলে আপনারা কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে উল্লাস করেন, এটা হলো ভারতীয় বা পাকিস্তানীদের বৈশিষ্ট। দর্শক হতে চাইলে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড-শ্রীলঙ্কার মতো হোন। জিতলে মাতাল হবেন, হারলে খেলোয়াড়দের বাড়ি আগুন দেবেন; অমন দর্শক আমাদের দরকার নেই। ওটা ভারতীয় ব্র্যান্ড।

ভারতীয়রা জিতলে রাস্তা আটকে মাতলামি করে, জিতলে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশী নারীকে অপমান করে এবং হারলে ধোনির বাড়িতে আগুন দেয়।

আজ যারা জয়ে এই মাতলামি করছেন; এরা নামেই বাংলাদেশী, নামেই এরা ভারত-পাকিস্তানের বিরোধী। আসলে স্বভাবে ষোলো আনা এই দুটি দেশের দুষ্ট দর্শকদের মতো।

আমাদের দুষ্ট দর্শক দরকার নেই।

সোর্সঃ প্রিয় ডট কম

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top