ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ই ডিসেম্বর ২০১৮ , ২৭শে অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ভোর ৫:১৮

ক্ষমতার বিষচক্রের বিরুদ্ধে জনগণের এজেন্ডা

থম থেকেই এটা স্পষ্ট হলো যে, অতীতের ভার, ক্ষমতা ও লুটেরা রাজনীতির বিষচক্র থেকে আমাদের সহজে মুক্তি নেই। ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া’ এবং ‘যুদ্ধাপরাধীর বিচার’ এই দুটো অনিষ্পন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র রাজনীতির বিষচক্রের থাবার মধ্যে দেশ হাবুডুবু খেতে থাকল বছরের শুরু থেকেই।
২০১৪ সাল শুরুই হয়েছিল সাধারণ নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা আর সহিংসতা দিয়ে। সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই বর্তমান সরকার গঠিত হয়েছে। যেভাবে নির্বাচন হয়েছে তাতে বর্তমান সরকারকে স্বনির্বাচিত বলাই শ্রেয়। নির্বাচনের এক বছর পূর্তির দিনে বিএনপি জোট বড় আকারে সমাবেশ করার ঘোষণা দেওয়ার পর সরকার সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করাসহ নানারকম দমনপীড়নের পথ গ্রহণ করে। প্রত্যুত্তরে বিএনপি জোট অনির্দিষ্টকাল অবরোধ ঘোষণা করে। জনসম্পৃক্ততা এর মধ্যে দেখা যায়নি। তাই প্রথম থেকেই তা সহিংসতার পথ বেছে নেয়। ‘জনগণ ছাড়া নির্বাচন’ আর ‘জনগণ ছাড়া আন্দোলন’ই যদি হয় দুই প্রধান দলের রাজনীতির পরিচয়, তাহলে তার ভয়াবহতায় জনগণের জীবন দুর্বিষহ হবে তাতে তো অবাক হওয়ার কিছু থাকে না।
সে জন্যই ৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে অবিরাম সহিংসতা। ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই ৩৪ দিনে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন মোট ৮৫ জন। এর মধ্যে পেট্রলবোমা ও আগুনে দগ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন ৫১ জন। এদের মধ্যে শিশু, নারী, তরুণ, বৃদ্ধ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী সব ধরনের মানুষই আছেন। সংঘর্ষ ও ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন ৩৪ জন। এর মধ্যে ক্রসফায়ারে বা বন্দুকযুদ্ধের নামে পুলিশ বা র‌্যাবের গুলিতে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জন। ক্রসফায়ারে নিহতদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী ছাড়াও দলহীন খুদে ব্যবসায়ী-শ্রমজীবী মানুষ আছেন। গ্রেফতারের সঠিক সংখ্যা সরকার প্রকাশ করেনি। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী এর সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিএনপি জোটের হরতাল-অবরোধ শেষ কবে হবে তার কোনো লক্ষণ বা সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, পেট্রলবোমায় ক্ষতবিক্ষত মানুষের সংখ্যাও তাই থামছে না। অদৃশ্য ঘাতকের পেট্রলবোমার সঙ্গে সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে পুলিশ-র‌্যাবের আক্রমণ। গ্রেফতার, দমনপীড়নের শিকার কে হবে তার ঠিক নেই। গ্রেফতার বাণিজ্যের শিকার হলে অল্পের ওপর দিয়ে গেলেও বহু হাজার টাকার মামলা। আর জীবন তো এখন কার যে হাতের মুঠোয় সেটাই সর্বক্ষণের দুশ্চিন্তা মানুষের। সরকারের গৃহীত সব পথ, পদ্ধতি : হুমকি, আলটিমেটাম, গ্রেফতার, ক্রসফায়ার ইত্যাদি দিয়ে যে সন্ত্রাস থামছে না, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না তা এতদিনে সবার কাছে পরিষ্কার হওয়ার কথা।
তবে সমাধান না হলেও প্রতিদিনই মন্ত্রী, সরকারি দলের নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিদের বাগাড়ম্বর আস্ফালন আমরা শুনছি। বলাই বাহুল্য, তাতে আমাদের স্বস্তি আসছে না। ১৯ জানুযারি সরকারের অন্যতম মুখপাত্র মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছিলেন, ‘কথা দিলাম, আগামী সাত দিনের মধ্যে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’ ২৮ জানুয়ারি বিজিবির মহাপরিচালক বলেছিলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক। আর কেউ বার্ন ইউনিটে আসবে না।’ পুলিশ ও র‌্যাবের কর্মকর্তাদের মুখেও বেশ কয়েকবার কঠিন হুমকি ও আশ্বাস শোনা গেছে। বলেছেন, সব সন্ত্রাসীর তালিকা করা হয়েছে। শিগগিরই সব দমন করা হবে। দেখামাত্র গুলির কথাও তারা বলেছেন। নেতা-মন্ত্রীরাও বলেছেন, বলেছেন সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেলও। পুলিশের ডিআইজি সবাইকে স্তম্ভিত করে গত ৭ ফেব্রুয়ারি বলেছেন, অপরাধীদের শুধু নয়, তাদের বংশধরদেরও নিশ্চিহ্ন করা হবে। ‘দেখামাত্র গুলি’তে মানুষ মরছে, নির্বিচার গ্রেফতার হচ্ছে, দমনপীড়ন অব্যাহত আছে কিন্তু চোরাগোপ্তা হামলা কমছে না। পথেঘাটে পেট্রলবোমা হামলার শিকার যেমন সাধারণ মানুষ, সঙ্গে সঙ্গে নির্বিচার গ্রেফতার ও দমনপীড়নের শিকারও সাধারণ মানুষই।
দলীয় সন্ত্রাস ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, পেট্রলবোমা আর দমনপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের শক্তির ওপর নির্ভর করে আমরা বিষচক্র থেকে বের হব, না আবার একই জায়গায় থাকবে সেটি। নতুন বছরে সর্বজনের স্বার্থচিন্তা ও রাজনীতি বিকাশের বিষয়গুলোই উত্থাপন করেছিলাম। ক্ষমতার রাজনীতির বিষবাষ্পে মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেসব বিষয় ধামাচাপা পড়ে গেছে। মানুষ এখন অস্তিত্বের সংকটে। কিন্তু এই অস্তিত্বের সংকট থেকে মুক্ত হতে হলে মানুষকে নিজের এজেন্ডা নিয়েই সোচ্চার হতে হবেÑ যেগুলো তার স্বার্থ, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। সেখান থেকেই প্রতিরোধের কার্যকর শক্তি তৈরি হবে। এছাড়া আর কোনো পথ নেই।
লেখক : কলামনিস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top
Loading...