ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ১১ই আশ্বিন ১৪২৪, ভোর ৫:৩৮

সাকিব- দ্য লোন টাইগার

এক দিনের ক্রিকেটে সাকিবের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ অপরাজিত ১৩৪, ২০০৭ সালে কানাডার বিপক্ষে ঐ ম্যাচটি কোন টেলিভিশন টেলিকাস্ট করেনি, আমারও দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তখন ইন্টারনেটও ছিল না। দৈনিক প্রথম আলোর খেলার পাতাই ছিল খবরাখবরের একমাত্র উতস। ত্রিদেশীয় সিরিজ শুরু হয়ে গেলেও নিশ্চিত হতে পারছিলাম না ম্যাচগুলো আন্তর্জাতিক ম্যাচের মর্যাদা পাবে কি না। পরে জেনেছি যে পেয়েছে।

লেখার শিরোনাম হচ্ছে লোন টাইগার বা একাকী বাঘ। সেখানে বাংলাদেশ-কানাডা ম্যাচের আলাপ অনেকের কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু আমি প্রথম একাকী বাঘের দেখা পেয়েছিলাম ঐ ম্যাচেই। মাত্র ৪ রানে ২ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর মাঠে নামেন সাকিব, ৩০ রানের ভেতর তামিমও আউট হয়ে যান। সেখান থেকে হাবিবুল বাশার আর আশরাফুলকে সাথে করে দলকে ভাল অবস্থানে নিয়ে যান তিনি। শুনতে অবাক লাগলে এটাই সত্য, মাত্র ২ বছর হল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা সাকিবই পথ দেখিয়েছেন এবং অভিজ্ঞ বাশার-আশরাফুল তাঁকে সঙ্গ দিয়েছেন মাত্র। অবশ্য শেষ দিকে আশরাফুলের ৪৫ বলে অপরাজিত ৬০ ইনিংসটিরও অবদান কম নয়।

এরপর বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষেও হাফ সেঞ্চুরী করে ম্যাচ জিতিয়েছেন সাকিব। কিন্তু সে অর্থে ওটা একাকী বাঘের মত লড়াই ছিল না। তামিম, মুশফিক, সাকিব সবারই অবদান আছে। আর বল হাতে ম্যান অব দ্য ম্যাচ মাশরাফির অবদান তো আছেই। কিন্তু একাকী বাঘ হিসেবে সাকিব আবার আবির্ভূত হন ‘০৭ বিশ্বকাপেরই ইংল্যান্ডের সাথে ম্যাচে। ঐ ম্যাচটি আমার স্মরনে থাকবে দীর্ঘদিন তার দুইটি কারন। এক, সেদিন আমি আমার চর্মচক্ষে দেখেছিলাম সাকিবের উত্থান। আর দুই, বাংলাদেশের ক্রিকেট এক নতুন জামানায় প্রবেশ করেছে। নতুন এক দিগন্তে বাংলাদেশের ক্রিকেট যাচ্ছে যেখানে হাবিবুল বাশার ছিলেন আগের প্রজন্মের শেষ প্রতিনিধি, শাহরিয়ার নাফীস আর মোহম্মদ আশরাফুল নতুন প্রজন্মের প্রথম প্রতিনিধি। তাঁদেরই উত্তরসূরী সাকিব-তামিম।

টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ওভারেই চমতকার দু’টি কাভার ড্রাইভে চার মারেন তামিম ইকবাল। কিন্তু বিপত্তির শুরু দ্বিতীয় ওভারের তৃতীয় বল থেকে। ঐ ম্যাচের আগে সাজিদ মাহমুদের জায়গায় স্টুয়ার্ট ব্রডকে নেয়ার জন্য তুমুল আলোচনা হচ্ছিল। কিন্তু ইংল্যান্ড সাজিদ মাহমুদকেই দলে রাখে। সাজিদের বলে তামিম ইকবাল কলিংউডের হাতে ক্যাচ দেয়ার আগের বলেও ক্রিকইনফোর লাইভ কমেন্ট্রি কিংবা টেলিভিশনের কমেন্টেটররা এক অর্থে সাজিদকে ধুয়ে দিচ্ছিলেন। ২৭ রানে ৩ উইকেট নিয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন তিনি। অবশ্য পরের ম্যাচেই আবার খারাপ করার পর দল থেকে বাদ পড়েন। এরপর আর একটিমাত্র ওয়ানডেই খেলেছেন সাজিদ, ২০০৯ সালে। ৪১ রান দিয়ে ১ উইকেট, এরকম এভারেজ পার্ফরম্যান্স দলে থাকার জন্য যথেষ্ট ছিল না। দক্ষিন আফ্রিকার বিরুদ্ধে খেলা সেই ম্যাচটিই এখন পর্যন্ত সাজিদের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। বর্তমানে ক্রিকেটের মূল স্রোত থেকে হারিয়েই গেছেন সাজিদ, এমনকি কাউন্টিতেও তাঁর সাথে চুক্তি নবায়ন করেনি এসেক্স।

সাকিব থেকে সাজিদে চলে যাওয়ার পেছনে কারন আছে। ধর্মের দিক থেকে তিনি স্বগোত্রীয় হওয়ায় তাঁর প্রতি সবসময়ই আমার আলাদা নজর ছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাজিদ একটি হতাশার নামও বটে। ২০০৬ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয়ে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা ছিল পাকিস্তানী বংশোদ্ভূদ সাজিদের। একারনে ব্রিটেনে বসবাসরত পাকিস্তানীরা তাকে ট্রেইটরও বলতেন। কিন্তু কেন যেন এই প্রতিভা প্রতিভাই থেকে যায়, পরিস্ফূটিত হয়নি।

খেলায় ফিরে আসি। তামিম আউট হওয়ার পর ক্রিজে আসেন হাবিবুল বাশার। ষষ্ঠ ওভারের পঞ্চম বলে সাজিদের বলে নাফীস ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল ভনের হাতে ক্যাচ দেন। কিন্তু ভন ক্যাচ ফেলে দিলে নাফীস স্ট্রাইকিং এন্ড চেঞ্জ করেন। অথচ উইকেটের মাঝখানে যেয়ে ভন ক্যাচ ধরে ফেলেছেন মনে করে বাশার হতাশায় মাথা নীচু করে থাকেন। পরবর্তীতে ভন বল কুড়িয়ে নিয়ে কীপারের হাতে দিলে বাশার রান আউট, নাফীস সেইফ। সেবার নাফীসও কিছু করতে পারেন নাই, ৯ রান করে আউট। ২০০৭ বিশ্বকাপ নাফীসের জন্য এক হতাশার নাম। এক ওভার বিরতি দিয়ে একই বোলারের বলে স্ট্রাউসের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন তিনি। কিন্তু নাফীস-বাশারের ঐ ঘটনা স্মার্ট ক্রিকেট ও প্রফেশনালিজমের নতুন বাংলাদেশের সাথে বাশারদের আগের বাংলাদেশের পার্থক্যের একটি বড় বিজ্ঞাপন বলে আমার ধারনা।

সেবার বাংলাদেশের অবস্থা কতটা করুন ছিল একটু দেখে নিই। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান ছিল যৌথভাবে মিস্টার এক্সট্রা এবং আব্দুর রাজ্জাকের, ১৫। তৃতীয় সর্বোচ্চ মাশরাফির, ১৩। এছাড়া দুই অঙ্ক ছুঁতে পেরেছিলেন আর একজনই, আফতাব। কাঁটায় কাঁটায় ১০। সাকিবের ৯৬ বলে হার না মানা ৫৭ রানের ইনিংস বাংলাদেশকে ১৪৩ রানের স্কোর এনে দেয়। মাত্র ৩৭ ওভার ২ বলেই অল আউট হয়ে যায় বাংলাদেশ, সঙ্গীর অভাবে ৭৫ বল আগেই সাকিবকে মাঠ ছাড়তে হয়। বাংলাদেশ ৪ উইকেটে হেরে গিয়েছিল। তবে ইংল্যান্ডের জয় অতটা সহজ ছিল না যতটা মনে হচ্ছে। ১১০ রানে ৬ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর ভাল সম্ভাবনা জেগেছিল বাংলাদেশের। কিন্তু নিক্সন আর কলিংউড কোন অঘটন ঘটতে দেন নাই।

একাকী বাঘ হিসেবে সাকিবকে আবার দেখি ২০০৮ সালে। অত্যন্ত বাজেভাবে সিরিজের চতুর্থ ম্যাচটি পাকিস্তানের সাথে হেরেছিল বাংলাদেশ। মুলতানে টস জিতে ব্যাটিঙে নেমে ১০৮ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। সেখান থেকে অলআউট হওয়ার পর বাংলাদেশের রান দাঁড়ায় ৪৯ ওভার ১ বলে ২১০। এই ম্যাচে অবশ্য সাকিব অপরাজিত ছিলেন না। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে পঞ্চাশতম ওভারের প্রথম বলে যখন তিনি আউট হন তখন তাঁর রান ১০৮, ইতোমধ্যে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরী তুলে নিয়েছেন। চরম বিরুদ্ধ পরিবেশে ৯০ স্ট্রাইক রেটে ১২০ বলে এই রান সংগ্রহ করেন তিনি। অথচ খুব যে স্ট্রোক প্লে ছিল তা না, মাত্র ৮টি ৪ মার মেরেছেন, কোন ছক্কা নেই। অথচ অনেক বেশী ছিল স্ট্রাইক রোটেটিং। আধুনিক ক্রিকেটে চার-ছয়ের চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ন স্ট্রাইক রোটেট। বাংলাদেশ যে ধীরে ধীরে সে দিকেই যাচ্ছে সেটা আশরাফুল-নাফীস ইঙ্গিত দিলেও পরিপূর্নতা আসে সাকিবের হাত ধরেই।

এপ্রসঙ্গে আরেকজনের কথা না বলাটা পাপ হবে। মাশরাফি। ৬৭ বল খেলে মাত্র ৫৭ স্ট্রাইক রেটে ৩৮ রান করা মাশরাফি। মাশরাফির ঐ ৬৭ বলে ৩৮ রানের ইনিংসটি না থাকলে কখনোই সাকিবের পক্ষে সম্ভব হত না সেঞ্চুরী করা। এটা তো আর পাড়ার ক্রিকেট না যে লাস্ট ম্যান ব্যাটিঙ করবে।

এরপর আবার একাকী বাঘ সাকিবের দেখা মেলে ২০০৯ সালে। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচ ৫০ ওভার থেকে ৩১ ওভারে নেমে আসে। ট্রাই ন্যাশন সিরিজের প্রথম ম্যাচে অপ্রত্যাশিতভাবে জিম্বাবুয়ের কাছে বাজেভেবে হেরে ফাইনাল খেলার আশা বাদই দিয়েছে বাংলাদেশ। কারন প্রতিপক্ষ শুধু শ্রীলঙ্কা নয়, জিততে হবে নেট রানরেট আর বোনাস পয়েন্টের সাথেও।

মাশরাফির অসাধারন বোলিঙে নির্ধারিত ৩১ ওভারের আগেই ১৪৭ রানে গুটিয়ে যায় লঙ্কানরা। ব্যাট করতে নেমে প্রথম ওভারেই ভুল বোঝাবোঝিতে রান আউট জুনায়েদ সিদ্দীক, দলীয় রান তখন শূন্য। খানিকবাদে ১ রান করে আউট হয়ে গেলেন মুশফিক। দলীয় ১১ রানে যখন তামিমও আউট হয়ে গেলেন তখন বাংলাদেশের সবচেয়ে আশাবাদী সমর্থকও জয়ের আশা বাদ দিয়ে আশরাফুল বা মাশরাফির ব্যাটের ঝলক দেখার আশাতেই স্টেডিয়ামে বসে ছিলেন। কিন্তু কে জানত যে বাংলাদেশ জিতবে তো জিতবে, বোনাস পয়েন্ট নিয়ে জিতে ফাইনালেও চলে যাবে!

ফাইনালে যেতে হলে ২৪ ওভার ৫ বলে ম্যাচ জিততে হবে। আশরাফুলকে সঙ্গে নিয়ে সাকিব চতুর্থ উইকেট জুটিতে ৯১ রানের পার্টনারশীপ গড়লেন। আশরাফুলের অবদান এতে মাত্র ২৫। ১৫ ওভারে ৬ এর উপরে রানেরেট নিয়ে গড়া এই জুটিতে আশরাফুলের ২৫ ছিল অনেক শ্লথ গতির। ৪১ বলে ২৫, স্ট্রাইক রেট মাত্র ৬৩। অথচ এরপরও পার্টনারশীপ থেকে ওভারপ্রতি গড়ে ৬ এর বেশী রান এসেছে। এথেকেই বোঝা যায় অপরপ্রান্তে কতটা বিধ্বংসী ছিলেন সাকিব।

দলীয় ১০২ রানে আশরাফুল আউট হলে ক্রিজে আসেন রকিবুল হাসান। ২ ওভার ৪ বলে এই পার্টনারশিপ থেকে রান আসে ২৪, যাতে রকিবুলের অবদান মাত্র ৩, ওভারপ্রতি রান ৯! অজন্তা মেন্ডিসের ঘূর্নিতে মুরালিধরনের হাতে ক্যাচ দিয়ে যখন রকিবুল সাজঘরে যান তখন বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত হয়ে গেছে, লড়াই এখন ফাইনালে যাওয়ার। ২০ বলে ২৫ দরকার, ৬ বল হাতে রেখেই নাঈম ইসলামের ৬ বলে ১২ আর সাকিবের ৮ বলে ১৩র সৌজন্যে ফাইনালে বাংলাদেশ।

এরকম একা একা লড়তে সাকিবকে অনেক দেখা গেছে। কখনো ব্যাট হাতে, কখনো বল হাতে। অলরাউন্ডার সাকিবের বোলিঙ নিয়ে লিখতে চাইলে এরকম কিংবা এর চেয়েও বড় একটা নিবন্ধ লিখতে হবে। এমনকি চাইলে ফিল্ডার সাকিবকে নিয়েও এর চেয়ে বিশাল লেখা সম্ভব। ওদিকে তাই আর যাচ্ছি না। তবে আমার দৃষ্টিতে একয়েকটি ম্যাচ একাকী বাঘ হিসেবে সাকিবকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আমাদের নতুন দিগন্তের স্বপ্নসারথী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন এগুলো দিয়েই। তখনই আমরা বুঝেছিলাম বাঘ আসছে।

 

লেখকঃ আশরাফ আজীজ ইশরাক ফাহিম

আশরাফ আজীজ ইশরাক ফাহিম

আশরাফ আজীজ ইশরাক ফাহিম

শখের লেখক, ব্লগার এবং অনলাইন এক্টিভিস্ট, কিশোর ও ক্রীড়া সাংবাদিক। বর্তমানে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত। আদি নিবাস রংপুর।
আশরাফ আজীজ ইশরাক ফাহিম

Latest posts by আশরাফ আজীজ ইশরাক ফাহিম (see all)

বাইশ গজে তুলির আঁচড়
নেপালে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো
আশরাফ আজীজ ইশরাক ফাহিম

আশরাফ আজীজ ইশরাক ফাহিম

শখের লেখক, ব্লগার এবং অনলাইন এক্টিভিস্ট, কিশোর ও ক্রীড়া সাংবাদিক। বর্তমানে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত। আদি নিবাস রংপুর।

Top