ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ১১ই আশ্বিন ১৪২৪, ভোর ৫:৩০

যৌন হয়রানি রোধে আমাদের আইন-আদালত

মারুফ আল্লামঃ যৌন হয়রানি আর ধর্ষণ এক কথা নয়। অনেকের ধারণা, ধর্ষণ দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও নারীর প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা কিংবা একটু-আধটু মজা করার উদ্দেশ্যে যৌনতাপূর্ণ মন্তব্য করা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। অথচ আইনের দৃষ্টিতে এ ধরনের আচরণ ‘যৌন হয়রানি’, যার দায়ে অপরাধীকে ৩ থেকে ৭ বছর মেয়াদের কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে।

গণপরিবহন, কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা রাস্তাঘাটে নারীর যৌন হয়রানি দিন দিন মারাত্মক রূপ ধারণ করছে। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের অর্থায়নে আইসিডিডিআরবি পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, দেশের ৬০ শতাংশেরও বেশি পুরুষ নারীকে যৌন হয়রানির মধ্যে এক ধরনের মজা খুঁজে পায় এবং এদের ৫০ শতাংশেরও বেশি পুরুষ এ ধরনের যৌন হয়রানির মধ্যে অপরাধের কিছু দেখে না। এজন্য তাদের মধ্যে কোনো প্রকার অপরাধবোধ কিংবা অনুতপ্ততা পর্যন্ত নেই।
‘যৌন হয়রানি’ যে ধর্ষণ থেকে স্বতন্ত্র একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং কেবল নারীকে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করলে কিংবা নারীর শ্লীলতাহানি করলে মারাত্মক রকমের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে- এ সম্পর্কে আমাদের জনগণের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ সচেতনতাই নেই। যৌন হয়রানির সংজ্ঞা এবং তার শাস্তি সম্পর্কে ধারণা না থাকায় লোকজনের মধ্যে যৌন হয়রানির প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।

 

আইনের চোখে ‘যৌন হয়রানি’ কী?
আমাদের আইনে যৌন হয়রানির প্রথম সংজ্ঞাটি আসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর মাধ্যমে। আইনের ১০ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে তার যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তার শরীরের যে কোনো অঙ্গ বা কোনো বস্তু দ্বারা কোনো নারী বা শিশুর যৌন অঙ্গ বা অন্য কোনো অঙ্গ স্পর্শ করেন বা কোনো নারীর শ্লীলতাহানি করেন তাহলে তার এই কাজকে বলা হবে ‘যৌন পীড়ন’।

২০০৯ সালের ১৪ মে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ একটি দিকনির্দেশনামূলক নীতিমালা প্রদান করেন। এই নীতিমালার ৪ ধারায় ‘যৌন হয়রানি’র স্পষ্ট ও বিস্তারিত সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। ধারা ৪(১) অনুসারে, যৌন হয়রানি বলতে বোঝায়- ক) অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আবেদনমূলক আচরণ (সরাসরি কিংবা ইঙ্গিতে) যেমন: শারীরিক স্পর্শ বা এ ধরনের প্রচেষ্টা; খ) প্রাতিষ্ঠানিক এবং পেশাগত ক্ষমতা ব্যবহার করে কারো সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা; গ) যৌন হয়রানি বা নিপীড়নমূলক উক্তি; ঘ) যৌন সুযোগ লাভের জন্য অবৈধ আবেদন; ঙ) পর্নোগ্রাফি দেখানো; চ) যৌন আবেদনমূলক মন্তব্য বা ভঙ্গি; ছ) অশালীন ভঙ্গি, অশালীন ভাষা বা মন্তব্যের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করা, কাউকে অনুসরণ করা বা অশালীন উদ্দেশ্য পূরণে কোনো ব্যক্তির অলক্ষ্যে তার নিকটবর্তী হওয়া বা অনুসরণ করা, যৌন ইঙ্গিতমূলক ভাষা ব্যবহার করে ঠাট্টা বা উপহাস করা; জ) চিঠি, টেলিফোন, মোবাইল, এসএমএস, ছবি, নোটিশ, কার্টুন, বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিল, নোটিশ বোর্ড, অফিস, ফ্যাক্টরি, শ্রেণিকক্ষ, বাথরুমের দেয়ালে যৌন ইঙ্গিতমূলক অপমানজনক কোনো কিছু লেখা; ঝ) বস্ন্যাকমেইল অথবা চরিত্র লঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে স্থির বা ভিডিও চিত্র ধারণ করা; ঞ) যৌন হয়রানির কারণে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং শিক্ষাগত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হওয়া; ট) প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যান হয়ে হুমকি দেয়া বা চাপ প্রয়োগ করা; ঠ) ভয় দেখিয়ে বা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপন বা স্থাপনে চেষ্টা করা;

 

যৌন হয়রানির সাজা
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারার অধীনে যৌন হয়রানির সাজা তিন থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং একই সঙ্গে অর্থদণ্ড। ২০০৯ সালের ১৪ মে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের নীতিমালাতেও শাস্তির বিধান সম্পর্কে বলা আছে। কর্মস্থল কিংবা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো নারী যৌন হয়রানির শিকার হলে ওই নীতিমালার ১১ ধারা অনুসারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে (ছাত্র ব্যতিরেকে) সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারেন এবং ছাত্রদের ক্ষেত্রে, অভিযোগ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী তাদের শ্রেণিকক্ষে আসা থেকে বিরত রাখতে পারেন। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করবে এবং সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রের শৃঙ্খলা বিধি অনুসারে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং যদি ওই অভিযোগ ফৌজদারি আইনের যে কোনো ধারা অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় তাহলে প্রয়োজনীয় ফৌজদারি আইনের আশ্রয় নিতে হবে যা পরে সংশ্লিষ্ট আদালতে বিচার হবে।

 

যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আদালতের নীতিমালা
যৌন হয়রানি প্রতিরোধে গত ১৫ বছরে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছে। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতে বাঁধন নামের এক তরুণী ঢাবির টিএসসি এলাকায় যৌন নিপীড়নের শিকার হলে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি (বিএনডাব্লিউএলএ) ২০০০ সালের ১৮ জানুয়ারি জনস্বার্থমূলক একটি রিট করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০০৬ সালের ২৩ মে ঢাকা সিটি বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কোনো নারী যাতে যৌন হয়রানির শিকার না হন, অসামাজিক কাজ যাতে না ঘটে; সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জ্যেষ্ঠ প্রক্টোরিয়াল কমিটির সদস্যদের নিয়ে অপরাধ প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ জানানোর জন্য থানায় ২৪ ঘণ্টা হটলাইন নাম্বার চালু করার কথাও বলা হয়। প্রতিটি কমিউনিটি এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানোর তাগাদা দেয়া হয়। নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, সরকারের উচিত সব থানায় স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার ও সচেতন নাগরিকদের নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কমিটি গঠন করা। পুলিশের মধ্যে একটি ন্যায়পালের পদ তৈরি করা।

বিএনডাব্লিউএলএ ২০০৮ সালের ৭ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং কর্মস্থলে নারী ও শিশুদের প্রতি যৌন হয়রানির প্রতিরোধের দিকনির্দেশনা চেয়ে আরেকটি রিট করে (রিট পিটিশন নাম্বার ৫৯১৬/২০০৮)। ২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি, বেসরকারিসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা জারি করে। ওপরে এই নীতিমালায় যৌন হয়রানির সংজ্ঞা ও তার সাজা সম্পর্কে কী বলা হয়েছিল, তা উল্লেখ করা হয়েছে।
হাইকোর্টের এই নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র বা রাস্তাঘাটে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলে সে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য কর্তৃপক্ষকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। এ অভিযোগ গ্রহণের জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি করে অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপন করতে বলা হয় এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্যাতিত ও অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় গোপন রাখতে বলা হয়। অভিযোগ কেন্দ্র গঠনের ব্যাপারে রায়ে বলা হয়, একজন নারীকে প্রধান করে অন্তত ৫ সদস্যের একটি অভিযোগ কেন্দ্র গঠন করতে হবে। এছাড়া কমিটিতে একাধিক নারী সদস্য থাকবেন। কমিটির দাখিল করার তদন্ত প্রতিবেদন দেখে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালত ব্যবস্থা নেবে।
২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগ আবারো একটি নির্দেশনা দেন, যেখানে প্রতিটি থানায় যৌন হয়রানিসংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণের জন্য পৃথক সেল গঠন এবং স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য স্থানে যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ থাকে, সেখানে বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলা হয়। গত ১৪ এপ্রিল ঢাবি এলাকায় যৌন নিপীড়নের ঘটনার পরও আদালত ১৬ এপ্রিল রুল দেন।

 

নীতিমালার আলোকে প্রণীত হয়নি আইন
২০০৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগের পক্ষ থেকে যে যুগান্তকারী নীতিমালা প্রণয়ন করে দেয়া হয়েছিল, সেটির আলোকে সংসদকে আইন প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। সংসদ কর্তৃক আইন করার আগ পর্যন্ত সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিমকোর্টের রায়ের বাধ্যকরী শক্তির বদৌলতে ওই নীতিমালাই আইন হিসেবে অনুসরণ করার ব্যাপারে আদেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কখনো সেই নীতিমালা কার্যকর করা হয়নি এবং সেগুলোর আলোকে সংসদ এখন পর্যন্ত কোনো আইনও তৈরি করেনি।
২০১০ সালের ২৫ আগস্ট আইন কমিশন একটি খসড়া আইন তৈরি করে। ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন, ২০১০ (প্রস্তাবিত খসড়া)’ নামের আইনটিতে মোট ২১টি ধারা রয়েছে। এছাড়া লঘু ও গুরুতর অপরাধ আলাদাভাবে চিহ্নিত করে একটি তফসিল সংযুক্ত রয়েছে। কিন্তু এ আইনটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

খালেদার বিরুদ্ধে চার্জশীট দাখিল
হাসিনাকে বান কি মুনের ফোন : রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার আহবান

Leave a Reply

Be the First to Comment!

Notify of
avatar
wpDiscuz
Top