ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ১১ই আশ্বিন ১৪২৪, ভোর ৫:২৯

কোন মানসিকতার দর্শক হতে চাই

বিশ্বকাপ ফুটবলের গল্প দিয়ে শুরু করি। ২০১০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার জার্সি পরে আমার এক বন্ধু বিগ স্ক্রীণে সবার সাথে খেলা দেখতে গিয়েছিলো। কিন্তু আর্জেন্টিনা ৪-০ গোলে জার্মানীর কাছে হেরে যাবার পরে আমার সেই বন্ধুটিকে লিটারেলি খালি গায়ে ঘরে ফিরতে হয়। কারণ জার্সি পরা অবস্থায় রাস্তায় অন্য দলের সমর্থকদের কাছে তাকে রীতিমতো নিগ্রহিত হতে হয়েছিলো। গতবার ব্রাজিল ৭-১ গোলে হারার পরে এমন ঘটনাতো টিভির খবরে দেখেছি। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের কোয়ার্টার ফাইনালে হারবার পরে ভারতীয় দর্শকেরা অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি দর্শকদের নানাভাবে harass করেছে অনেকেই এমন অভিযোগ করছিলেন। অতি নিন্দনীয় ব্যাপার। কিন্তু আমরা নিজেরা আসলে এই বিষয়ে কতটুকু ভালো? বিশ্বকাপ ফুটবল অথবা মেসি-রোনালদো নিয়ে আমরা যেভাবে নিজেদের মধ্যে মারামারি করি সেখানে বাইরের কাউকে পেলে কি করতাম আল্লাহই জানে!

 

পাকিস্তান তো গোণা থেকেই বাদ, আর আমরা ভারতের সমালোচনা করি তাদের মানসিকতার কারণে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট চলবার সময় স্টার ক্রিকেট প্রায় প্রত্যেকটা দল ধরে ধরে যেভাবে “মওকা মওকা” বিজ্ঞাপন বানিয়েছে সেটাতে প্রত্যেকটা দেশের কাছে নিজেরা নিজেদের শত্রু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কোয়ার্টারের আগে তাদের বিজ্ঞাপনের স্লোগান ছিল, “ইয়ে ওয়ার্ল্ডকাপ নেহি, ইয়ে ওয়ার্ল্ড ভার্সেস ইন্ডিয়া হ্যা!” অর্থাৎ বিশ্বকাপ নয়, এটা বিশ্ব বনাম ভারত। আপনি নিজেই যখন নিজেকে সারা বিশ্বের প্রতিপক্ষ হিসেবে ঘোষণা করবেন তখন আসলে বলার কিছু থাকে না। ভারত নিজেরাই চায় সবার সামনে শত্রু থাকতে। পাকিস্তানের মিডিয়ায় বাংলাদেশের জয়ের পরে রমিজ রাজা, ডক্টর নোমান যেভাবে কথা বলেছে তাতে তারা নিজেদের নগ্ন মানসিকতাই প্রকাশ করেছে।

 

কথা হচ্ছে, আমরা কি খুব ভালো কিছু করছি? নিয়মিত রেপের ঘটনার কারণে আমরা ইন্ডিয়াকে নিয়মিত “রেন্ডিয়া” ডেকে যাচ্ছি। কিন্তু গত দুই মাসের ঘটনায় বাংলাদেশও কি সে পথ থেকে খুব বেশি পিছিয়ে?  নিয়মিত একটার পর একটা রেপের ঘটনার খবর আসছে, একেবারেই প্রকাশ্য ঘটনা। ভারতের তরুণ সমাজের বিক্ষোভে পড়ে দামিনীর ঘটনার বিচার হয়েছিলো। আমাদের দেড় মাস আগে ঘটা পহেলা বৈশাখের ঘটনা কিংবা গারো তরুণীর ঘটনা চাপা পড়ে যাচ্ছে!  এই দুঃখ কোথায় রাখি?

 

প্রসঙ্গে ফিরে যাই। ডেল স্টেইন বাংলাদেশের সাথে খেলা মানে শক্তির অপচয় করা বলে আমাদের সবার সামনে ভিলেন হয়েছে। ব্রেট লি কিন্তু সম্মান দিয়ে কথা বলে শ্রদ্ধা আদায় করে নিয়েছে। বিশ্বে সবচেয়ে সম্মানিত ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ হচ্ছে নিউ জিল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা। সবাই তাদের পছন্দ করে তাদের অ্যাটিটিউডের কারণে। গতবার হেইডেনের “মেলবোর্ন ইজ সো বিগ” শোনার পরে কিউইরা দেখিয়েছিলো ভদ্রভাবে কিভাবে রিপ্লাই দিতে হয়। পুরো টুইটার ভরিয়ে দিয়েছিলো, “মেলবোর্ন ইজ সো বিগ বলে”। একের পর এক রসাত্মক অথচ ভদ্র উত্তরে জাতি হিসেবে শ্রদ্ধা আরও বাড়িয়ে নিয়েছিলো কিউইরা। আর স্টেইন ক্ষমা চাইবার পরেও তার কথার রিপ্লাই দিতে গিয়ে গালিগালাজ আমরা বরং বিশ্বের কাছে আরও খারাপ হয়েছি। অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের দর্শকেরা তাদের নিজেদের “Boo” করে। আবার টেন্ডুলকার যখন ব্যাটিংয়ে নামতো, তামিম যখন লর্ডসে সেঞ্চুরি করেছে তখন পুরো গ্যালারি দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে।

 

একেবারেই রিসেন্টলি মোজো যে বিজ্ঞাপনটি করেছে আমি সেটার নিন্দা জানাই। ঠিক যে কারণে “মওকা মওকা”র নিন্দা জানিয়েছি, একই কারণে আমি মোজোর বিজ্ঞাপনেরও নিন্দা জানাই। আমরা ইন-শা-আল্লাহ অবশ্যই ভারতের সাথে জিতব। ৩-০ তে হোয়াইটওয়াশই টার্গেট। টেস্টে ন্যূনতম ড্রয়ের টার্গেট। কিন্তু এভাবে পাকিস্তানকে “হ্যারিকেন ধরিয়ে দিয়েছি” আর ভারতকে “বাঁশ দিব” টাইপ কথা বললে, আমরা নিজেদের ভারত-পাকিস্তান থেকে খুব বেশি আলাদা প্রমাণ করতে পারব না। এই বিজ্ঞাপন আর মওকা মওকা বিজ্ঞাপনের মধ্যে কোনই পার্থক্য নাই। বরং ভাষা ব্যবহারে “একটা মওকা পাইসি”র চেয়ে “বাঁশ দিব” অনেক বেশি অফেন্সিভ কথা!

 

আমরাই বছরের পর বছর হারবার পরেও নিঃশর্ত ভাবে ক্রিকেটারদের সমর্থন দিয়ে গেছি। বিশ্বের সামনে আমাদেরই কিন্তু সবচেয়ে “প্যাশনেট ক্রিকেট পাগল জাতি” ধরা হয়। আবার আমরাই মুশফিক-সাকিব-তামিমের স্ত্রীদের গভীর রাতে ফোন করে গালিগালাজ করেছি। ক্রমেই আমরা কিন্তু দর্শক হিসেবে ভারতীয় মানসিকতার দিকেই এগুচ্ছি। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে সমর্থক হিসেবে আমরা কেমন হতে চাই? আমরা কি “ভারত-পাকিস্তানের” দর্শক, মিডিয়ার মতো সবার কাছে অশ্রদ্ধা অর্জন করতে চাই, নাকি নিউ জিল্যান্ড-সাউথ আফ্রিকার দর্শক-মিডিয়ার মতো শ্রদ্ধা অর্জন করতে চাই। মানসিকতা আমাদেরই নির্ধারণ করতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ভালো মানসিকতার ভদ্র দর্শকের ইমেজই পেতে চাই

শেখ মিনহাজ হোসেন

শেখ মিনহাজ হোসেন

বাংলায় কথা কই, বাংলায় লেখা লিখি
শেখ মিনহাজ হোসেন

Latest posts by শেখ মিনহাজ হোসেন (see all)

বোঝা গেল বিএনপি ভারতবিরোধী নয়? – আব্দুল কাইয়ুম
শেখ মিনহাজ হোসেন

শেখ মিনহাজ হোসেন

বাংলায় কথা কই, বাংলায় লেখা লিখি

Leave a Reply

Be the First to Comment!

Notify of
avatar
wpDiscuz
Top